না। আজ আর কোনো ধর্মীয় কথা বা উপদেশ দেওয়ার জন্য এই লেখা নয়। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক তথাকথিত ‘জ্ঞান’ দেওয়ার জন্যও অনলাইন এই মাধ্যমের ডিজিটাল কলম আজ হাতে তুলে নিইনি আমি। সেসব সময় অপচয় করার জন্য তো আপনারাই আছেন সমস্ত সামাজিক আঙ্গিকে ভিড় করে ঠাসাঠাসি হয়ে। তাদের মধ্যে বহু মুখই আবার আমার বেশ কিছু চেনাশোনা মানুষের এবং আজকের এই দুর্দিনে যাদের বলতে বাধ্য হচ্ছি, ভীষণভাবে অজানাও। কোনোদিন সত্যিই ভাবিনি, এইসব টানাটানির মধ্যে নিজের নাম কোনোভাবেও জড়াতে দেবো আমি — কিন্তু ভাবনাদের অনেক সময়ই ভেঙেচুড়ে বেড়িয়ে আসতে হয় আত্মপক্ষসমর্থনে। হ্যাঁ, দেরিতে হলেও আজ সেই সময় হয়তো এসেছে। তবে আগেই গেয়ে রাখা ভালো; না, কোনো প্রতিবাদ গড়ে তুলতে এই মনন আজও একান্তই বড় অপারগ। আমি শুধু সাজাতে চাইছি আমার ভাবনাগুলোকে, যেটুকু আমার বোধগম্য।

তেত্রিশ বছরের জীবনকালে বহু ওঠাপড়াই তো দেখলাম। কখনও ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে, কখনও রাজনৈতিক দলের তর্জনী বাগিয়ে ধরে বহুজনেই বেশ লড়াইও করল এই হাজার কোটি বছরের শ্যামলা রঙিন প্রকৃতির সামান্য সীমিত পরিসরে। ‘ক’ বলল,“ ‘খ এর গায়ের রঙ, বর্ণ রূপ আমাদের থেকে আলাদা — ওরা আমাদের সমগোত্রীয় নয়। তাই আমাদের জায়গা আমরা কিছুতেই এদের সাথে ভাগ করে নেবোনা।”

হয়তো তখনই আবার ‘খ’ অন্য কোথাও ‘গ’এর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে বলছে, “ওর ধর্ম আলাদা — ওকে এভাবে বাঁচতে দেওয়া যায়না।”

এই ‘গ’ ও কিন্তু সহজ মানুষ নয় — এদের মধ্যেও বিভেদ আছে প্রবল! এরা কন্যাসন্তানদের আজকের দিনেও স্কুলে পাঠায় না। শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নানাবিধ অত্যাচার করে দুস্থদের উপর।মাথা তুলে বাঁচতে দেয় না। সময় সুযোগ পেলে এই ‘গ’ ই হয়তো ‘ক’ এর সাথে বন্ধুত্ব জমায় আড়ালে আবডালে — কেড়ে নেয় তাদের দু পক্ষের একই শত্রু – সেই ‘খ’ য়ের সমস্ত সহায় সম্বল!

খুব জটিল মনে হচ্ছে কি এই উপমা? সত্যিই তো, আপনি তো আর এইসবের সাতে পাঁচে থাকেন না – নিজের অফিসে অন্য যোগ্য প্রার্থীদের ডিঙিয়ে কিভাবে উঁচুতলার চেয়ারের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন, কোথায় কোথায় তার জন্য খোশামোদি করবেন, সেই নিয়েই এখন মগ্ন – আর নিজের এই উন্নতির পথে এসব বোঝার সময় কোথায় আপনার? তাহলে?

তাহলে আর কি, আমিই নাহয় সরল করে বুঝিয়ে বলি আরেকটু। দায়টা যে আমারও জীবনের একমাত্র রসদ – নিজস্ব মননের কাছে বাঁধা চুপিচুপি করা মন্ত্রণা!

সবাই নিজের লাভের চেষ্টায় ব্যস্ত। কেউ তার ভিটেমাটি বাঁচাতে চায় লেঠেল ভাড়া করে অন্যদের তাড়িয়ে, কেউ আবার ব্যস্ত নিজের জাতপাত, ধর্ম, রাজনীতি, বা তার নিজস্ব সারাজীবনের সঞ্চয়ে। না, এখানে পুণ্য সঞ্চয়ের কথা হচ্ছে না। হচ্ছে টাকাপয়সা, লোভ, অধিকারবল, শাসন — এসব নিয়ে সাধারণ আলোচনা। আর অবশ্যই কথা হচ্ছে নিজেকে কোনো না কোনোভাবে অন্যের থেকে বড় বা প্রয়োজনীয় দেখানোর আমাদের আদিম প্রথাগত নিকৃষ্ট অস্ত্র — ছল নিয়ে জল্পনা।

তা, নিজেকে অন্যের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখতে সবসময় কি করা উচিত — ঠিক ধরেছেন, এই অপরপক্ষকে ঠেলে কয়েকধাপ নামিয়ে দিতে হবে।নিজে উঠতে না পারলে আর কিই বা করার থাকে, তাই না? তাই চটজলদি ফন্দি এঁটে নিই প্রমাণ করতে যে অন্যজন কতখানি দুর্বল! ব্যাস, তাহলেই কেল্লাফতে! হ্যাঁ এইসব টানাহেঁচড়া করলে রক্ত একটুআধটু ঝরবেই, মাথাও ফুটবে এদিকসেদিক কয়েকটা, হয়তো নিজেরও সামান্য কাটাছেঁড়া হবে, চোট লাগবে  — তবে এসব ছোটখাট ‘ত্যাগ’ নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। সৈন্য মারা গেছে? ‘শহীদ’ তকমা আঁটো শিগ্গির — তাতে মিডিয়ার সমবেদনাও মিলবে, মন্দ না! তাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কাঁদছে,বা সদ্য বিবাহিতার হাতে উঠছে সাদা থান — এর চেয়ে ভালো তো কিছু হতেই পারেনা! এক্ষুণি ফ্রেমবন্দী করো! দেখো দর্শকদের কান্নার একফোঁটা ও যেন নষ্ট হয় না! একবার ভালো দিকটা ভাবো, ওদিকে শত্রুপক্ষের রক্তগঙ্গা তো বইল! নিঃশেষিত হল গ্রামের পর গ্রাম, রক্তাক্ত হল অন্যের ধর্মীয়স্থান! তাই বা কম কি? আর কেউ যদি কিছু বলতেও আসে, অকাট্য যুক্তি তো আমাদের হাতের মুঠোতেই রয়েছে — ওরাও আমাদের মেরেছে, বাড়ির মেয়ে বউকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে, ওদের জঙ্গী হামলায়ও প্রাণ গেছে আমাদের শতাধিকের — তার বেলা? আগের সরকার কি করেছে এই নিয়ে? কিচ্ছু না। তাই এবারে আইন আমরা নিজেরাই তুলে নিয়েছি নিজের হাতে – প্রয়োজনে তা পাল্টাতেও দ্বিধাবোধ করব না।

এসব মূর্খতার আসলে কি জানেন, কোনো উত্তর হয় না। এদের বোকামির সামনে দাঁড়িয়ে  যদি বলেনও মাথা তুলে ‘তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবনা কেন’ — এরা শুনবে না। কারণ, মানুষ হতে গেলে তো ‘মান’ এবং ‘হুঁশ’ দুটোই প্রয়োজন — এই তথাকথিত কোনো মানবগোষ্ঠীই এসবের ধার কিন্তু কিছুতেই ধারে না।

অবশ্য, সত্যিই কি দোষ দেওয়া যায় খুব একটা? আমরা যে মানুষ, বাকি জীবজন্তুদের থেকে আলাদা — এই বীভেদ বা ব্যবধানই কি আমাদের প্রথম মনুষ্যত্ব থেকে সরে আসার নমুনা নয়? আমাদের পরিচয়,আমরা জীবন — নিশ্বাস  প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে রক্ত সঞ্চালন হয়ে চলেছে আমাদের শিরা উপশিরা দিয়ে প্রতিনিয়ত — উদ্ভিদের শরীর বেয়ে রৌদ্রকণা ছড়িয়ে পড়ে সালোকসংশ্লেষ হওয়া থেকে সেই রূপ কিন্তু সত্যিই বড় বেশি বিচিত্র নয়। অথচ, এই যে ‘আমরা মানুষ, আমরা শ্রেষ্ঠ’ – তকমা গায়ে লাগিয়ে আদিকাল থেকে ঘুরে বেড়িয়েছি একরোখা, কয়েক মিনিটে পুড়ে ছাই করেছি জঙ্গল, ভেঙেছি অলঙ্ঘনীয় পাহাড় পর্বত, দূষিত করেছি নদী, সমুদ্রের জল, প্রাকৃতিক সম্পদ — সবই তো এই মিথ্যে অধিকারবোধ থেকে সৃষ্ট ‘অগ্রগতি’ – তাই না? আমাদের ঈশ্বরকেও আমরা আমাদের রূপ দিয়েই এঁকেছি কেন জানেন, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে অন্যকে অবদমিত করতে যাতে নির্বিচারে ব্যবহার করতে পারি তাদেরকেই, নিজেদের ইচ্ছেমতো। প্রকৃত ঈশ্বর কি সত্যিই আদপে এতটা পরশ্রীকাতর, নিকৃষ্ট, স্বেচ্ছাচারী জীবকে সৃষ্ট করতে পারেন কখনও নিজের রূপ ও আবরণে? সব ঝগড়াঝাঁটি, বিরোধ পাশে সরিয়ে যদি কোনোদিন একটুও সময় পান, ভেবে দেখবেন তো খানিক, আমাদের থেকে অপ্রয়োজনীয় আর কিই বা ঠিক আছে এই ইহজগতে?

আর কথা বাড়াবো না। এটুকুই বলার ছিল আমার। তবে বলার পর মনে হচ্ছে, এগুলো কিছুই শোনার বা দেখার ক্ষমতা আমাদের কোনোদিনই আদৌ হবে কি? জানি না। এসব হাহাকার বা হাহুতাশ, যাই বলুন না কেন, প্রকৃতপক্ষে তো আসলে, ‘অরণ্যে রোদন’ ছাড়া আর কিছুই না!

এই লেখিকার আরেকটি লেখা : বর্ষামঙ্গল কাব্য
বাংলা কবিতা : সেদিন বৃষ্টিতে

Comments

After my schooling at South Point, I have went on to study business management at Techno India. I am currently a working professional in Core Marketing at Real Estate Sector. My passion includes a conglomeration of interests including learning new facets, writing creative pieces and photography. Happily married to my school buddy and an IT professional, Sumitava. I am currently settled at Kolkata.