“তোমার মঙ্গল হোক!” আশীর্বচন দেন সনাতন ব্রহ্ম ।

নীপবীথি হাসে। “ ভালো বললেন বটে! ‘মঙ্গল’! তা এমন ঘন বর্ষায় মঙ্গলকাব্য রচনা কি সম্ভব?”

স্মিত হাসেন মহারাজ। “কেন মা? এই কালো জলদ্গম্ভীর ঋতুর উপর এত রাগ কিসের তোমার? এইসময়ই তো ঘটে গোপনে কত অভিসার, প্রেমের স্রোতে মিলমিশ খায় মিলনসাধন! অনুরাগ, অভিমান, বিরহ — সবই উ্মোচিত, অবারিত, অনাবিল এই বর্ষাকালেই।আবার, কত কবিতা, গান, নাটক লালিত, প্রতিফলিত, উদ্ভাসিত, আপ্লুত — এর রঙ, রূপ, মাটির সোঁদা গন্ধে! মিঁয়া তানসেন এমনই ঘনঘোর বর্ষায়ই শোনা যায়, ধরেছিলেন ‘রাগ মেঘমল্লার’। তবু এত সন্দিহান কেন তুমি মা? তোমার বুঝি পছন্দ হয়না এই ঋতুরাজকে?”

নীপবীথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে। “আমার পছন্দে কি কিছু যায় আসে প্রকৃতির? সে তো চলবে তার নিজের সৃষ্ট নিয়মেই! তাতে কার কি এলো গেলো, কিচ্ছু যায় আসেনা আপনার রূপসী বর্ষার। কখনও সে প্রলয়ঙ্করী– গর্জনে আর বারিধারায় ভাসিয়ে দেয় গ্রামের পর গ্রাম। পচা গলা উৎলে পড়া জলের তোড়ের সাথে একযোগে সঙ্গ দেয় মরা মানুষ আর ফুলে ওঠা গৃহপালিত গরুর পাল। বাচ্চারা মা বাবাদের হারিয়ে হাহাকার করে ওঠে, তবু কেউ বুকে তুলে নেয়য়া তাদের। না, আপনার বর্ষাও নয়! তাদের ঠিকরে আসা খেতে না পাওয়া চোখের দিকে কিভাবে তাকানো যায়, জানেন আপনি? কিকরে জানবেন, আপনারা তো তার প্রেমিক সত্তাকে নিয়েই তখন ঠাণ্ডা ঘরে বসে পাতার পর পাতা ভরিয়ে হন রোমাঞ্চিত! কোথায় কোন ভেলায় জড়োসড়ো করে বসে রয় নেড়িকুকুর আর সদ্য বৈধব্যপ্রাপ্ত যুবতী— সে খবরে কি আর সুখ জাগে কখনও?

আবার কোনও বছর কি মতি হয় কে জানে, শ্রাবণ পেরিয়ে যায়, তবু বৃষ্টির দেখা আর মেলেনা। এও আর এক বিপত্তি! নিত্য ফসল সব মাঠেই শুকিয়ে ইঁট হয়ে যায়— চাষীভায়াদের আত্মহত্যায় গ্রামের পর গ্রামে ওঠে কান্নার রোল। খরার কোপে পুড়ে ছাই হয়ে যায় বাচ্চা বুড়ো- সকলে।

এবার কি বলবেন জানি.. অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি — সবই তো ঈশ্বরের কৃপা, মেনে নিতে হয়। এর অন্যথা হওয়ার উপায় নেই! তবে কিসের এই মোহময়তা, বলুন? বর্ষা শুধুমাত্র ভয়াল এক কালশাপ, যার ছোবল থেকে রক্ষা নেই কারও! ঠিকই বলেছেন অবশ্য, ঋতুরাজই বটে, তবে ওই আর কি— বর্ষা স্বৈরাচারী লম্পট স্বার্থাণ্বেষী রাজা বই আর কিছু নয়। তাকে দেখলে ঘৃণায় মুখ ঘোরানো যায়, তবু ভালবাসা যায়না!”

চোখ বন্ধ করে স্থিরবৎ হয়ে এতক্ষণ বসেছিলেন সনাতন ব্রহ্ম তাঁর প্রিয় বটগাছের ছায়ায়। কপাল খানিক প্রসস্ত, তবু তাঁর সুঠাম মেদহীন শরীরে বয়সের প্রভাব বাসা বাঁধেনি এখনও। তাঁর সৌম্যকান্ত রূপ অনাড়ম্বর তবে অতুলনীয়ও বটে। বিশ্বাস করলে যেন এঁনাকেই করা যায়। তিনি যেন স্বয়ংভূ! ঈশ্বরতুল্য উপবিৎধারী।

“ তোমার রাগের মর্মার্থ আমি উপলব্ধি করছি মা। তোমার যুক্তি যথাযথ। আমি সাধারণ এক ভিক্ষু, তোমার প্রশ্নের নিরশন কি আর আমার করার সাধ্যে কুলোয়? তবে কি জানোতো মা, বর্ষা এতটাও হৃদয়বিদারক কিন্তু হয়না সর্বদা। সে নিজে একধারে প্রকৃতির নিয়মেই রাজদণ্ডধারী, তারই উপর ভার পড়ে নদী নালা বাঁচিয়ে রাখার, সকলের পর্যাপ্ত খাদ্যসংস্থানের, গ্রীষ্মের দাবদাহে জীর্ণ রূপ পুণরূত্থানের— আবার অপরদিকে, সে নিজেই জননী, সন্তানের দুঃখজ্বালায় সন্তাপি। রাজবেশ পরে দায়িত্ব এড়ানো যায়না, আমাদের অনিয়ন্ত্রিত অভিলাষে ধরণীর ভারসাম্য নষ্ট হয়, তারই প্রকোপে বৃষ্টির এই খামখেয়ালীপনা। আবার দীনহীন মানুষের পরম উপকারী বন্ধুও তো সে বটে — কি বলো মা!”

নীপবীথির চোখে প্লাবণ নামে অঝোরে। “জানিনা বাবা। কিচ্ছু জানিনা । শুধু শহরের ফুটপাথে যখন ভিজে শাড়ির উপরেই দোলনা বানিয়ে তার উপরেই মা ঘুম পাড়ায় সদ্যোজাত শিশুকে, তখন আতঙ্কে কেঁপে উঠি। এক সপ্তাহের জমা জলে যখন আন্ত্রিক ম্যালেরিয়ার বীজ জন্মায়, বস্তির মধ্যে এক খাটে তখন পেটে খিল দিয়ে বসে থাকে ‘দিন আনি’দের পরিবার। মৃত্যু সন্ধি পাতে বর্ষার আঁতূড়ঘরে— এ কেমন নিয়তি? কেন?”

“দেখো মা, আজ যদি এই ঋতুটা আর নাই থাকে আমাদের জীবনে, তাহলে ঠিক কেমন হবে জানো? আমাদের শেষ আশ্রয় — সেই আশা ভরসাগুলোও আর তখন ঝরে পরবেনা আকাশ থেকে। অবাক বিষ্ময়ে কোনো শিশু আর উপভোগ করবেনা স্বর্গচ্যূত এই মণিমুক্তর সম্ভার! বিরহের দংশন লোকাবেনা কোনো রাধিকা নব সিঞ্চিত এই প্লাবনে। প্রবল খরা অধ্যুষিত এলাকায় বৃষ্টি কখনও আনবে না আর প্রশান্তি, তৃষ্ণার্ত বক্ষ শুষ্কই থাকবে, কোথাও মিলবেনা তবুও পরিসুদ্ধ জলের খোরাকি। ” থমকালেন খানিক মহারাজ , হয়তো দম নেওয়ার জন্যই।

খানিক জিরিয়ে তিনি নীপবীথির মাথায় হাত রাখলেন, “বাড়ি যাও মা। অনেক রাত হল। আর মান করে থেকোনা। বর্ষা কেড়ে নেয় যা কিছু, তার চেয়ে ঢের বেশী উজাড় করে দেয়। আমরা অন্ধ, তাই মিছে দোষ দিই তাকেই যে আমাদেরই ভবিতব্যের বাহক। এই পুকুর নদী সমুদ্র সাক্ষী— যদি অমৃত বলে সত্যিই কোনোদিন কিছু থেকে থাকে, তবে তা এই জলধরের বক্ষস্থলেই সমাহিত!”

রাস্তায় নামে নীপবীথি। বাড়ি কোথায় তার যে সে বাড়ি যাবে? অহেতুক কথায় সন্ধ্যা গেল— মহারাজকে বলাই হলনা তার গৃহত্যাগের কথা। কি ব্যবস্থা হবে এবার এই ঘোর বরষায়?

হঠাৎ শরীরের সব রক্ত তার জলে পরিণত হল। তার নিশ্বাসের উষ্ণতায় সেই জল বাষ্প হয়ে হাওয়ায় দোল খেয়ে বেড়ালো আপনমনে। তারপর ভেসে চলল তার অতীতকে পিছনে ফেলে মেঘেদের ছাউনিতে, অনেক দূরে!

আর ঠিক তখনই ———

বর্ষামঙ্গল কাব্য গেঁথে নিলেন মহর্ষি সনাতন ব্রহ্ম ঝরে-পড়া নীপবীথির বৃষ্টিবিন্দুদের সহমর্মিতায়।

Related: A different kind of monsoon memory

Comments

After my schooling at South Point, I have went on to study business management at Techno India. I am currently a working professional in Core Marketing at Real Estate Sector. My passion includes a conglomeration of interests including learning new facets, writing creative pieces and photography. Happily married to my school buddy and an IT professional, Sumitava. I am currently settled at Kolkata.