“ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া /ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশিরবিন্দু” – স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ স্বরূপ এই উদ্ধৃতিটি যিনি পেয়েছিলেন তিনি যে জীবনে বড় কিছু করবেন এ তো
বলাই বাহুল্য, তিনি সত্যজিৎ রায়। বাংলা সাহিত্য, চলচ্ছিত্র,ও চিত্রকলায় এক অন্য মাত্রা যোগ করেছিলেন তিনি,
বিশ্বের দরবারে বাংলা সিনেমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন পরিচালক, চিত্রনাট্যকার,
সুরকার, গীতিকার, চিত্রকর এবং লেখক ― এককথায় বহুমুখী প্রতিভাবান। চলচ্ছিত্র জগতে যিনি আজও
‘মানিকদা’ নামেই পরিচিত।

কলকাতার বিখ্যাত ‘ রায় ’ পরিবারের সন্তান ও সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ ছোটো থেকেই গান শুনতে ও ছবি
আঁকতে ভালোবাসতেন। কৈশোরে শান্তিনিকেতনে কিছুদিন ছবি আঁকা শিখেছিলেন তিনি। তিনি বুঝতে
পেরেছিলেন যে, সেই সময়ে বাংলা সিনেমা ও গানের অবস্থা শোচনীয়।১৯৪৩ সালে ডি.কে. গুপ্তের‘সিগনেট
প্রেস’এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিশুদের জন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “আম আঁটির ভেঁপু”-র ছবি আঁকতে গিয়ে
“পথের পাঁচালী”-র দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। ১৯৪৯ সালে প্রখ্যাত পরিচালক জ‍্য রেঁনোয়া “দ‍্য রিভার ”-
এর শুটিংয়ে কলকাতায় এসে সত্যজিতের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁকে সিনেমা করে জন্য উৎসাহ দেন। এরপর
বিজ্ঞাপন সংস্থার কাজে ইংল্যান্ডে থাকার সময় সত্যজিৎ ইউরোপের বিখ্যাত সব সিনেমা দেখার সুযোগ পান।
পরে দেশে ফিরে বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্খীদের সহযোগিতায় “ পথের পাঁচালী” নির্মাণের কাজ শুরু করেন। বহু
বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সেই সময়ের সরকারের সাহায্যে অবশেষে তাঁর স্বপ্ন সত্যি হলো।

Satyajit Ray 'Manik'

সাল ১৯৫৫; ভারতীয় সিনেমার আকাশে আবির্ভাব ঘটলো এক নক্ষত্রের, মুক্তি পেল “পথের পাঁচালী” যা
আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমাকে চিরকালীন পরিচিতি দেয়। কান আন্তর্জাতিক চলচ্ছিত্র
উৎসবে এই সিনেমা ‘মানবতার শ্রেষ্ঠ দলিল’-এর শিরোপা পায়। তারপর তিনি “পথের পাঁচালী”-র কেন্দ্রীয় চরিত্র
‘অপু’ কে নিয়ে “অপরাজিত” ও “অপুর সংসার” নামে আরও দুটি সিনেমা বানান । এই তিনটি সিনেমা ‘অপু
ট্রিলজি’ নামে পরিচিত। “ অপরাজিত”-র মাধ্যমে সিনেমায় অভিনয় শুরু করার কথা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের
কিন্তু বয়স একটু বেশি হওয়ার জন্য সত্যজিৎ ওনাকে “অপুর সংসার”-এ সুযোগ দেন; পরবর্তীকালে যিনি
সত্যজিতের সাথে আরও অনেক সিনেমা করেন , বাঙালির ‘ফেলুদা’ হয়ে ওঠেন এবং বর্তমানে জীবন্ত
কিংবদন্তি। “অপুর সংসার”- এ অভিনয়ে হাতেখড়ি হয় ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরের। “অপুর সংসার”
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্ছিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়।

নিজের লেখা দুটি ফেলুদা কাহিনী “সোনার কেল্লা” ও “জয় বাবা ফেলুনাথ”-কে সেলুলয়েডে ধরেছিলেন তিনি;
এই ছবিদুটি চিরকাল আট থেকে আশি সবার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ফেলুদা নিয়ে অনেক
পরিচালক সিনেমা বানালেও ওনার বানানো এই দুটি সিনেমা বাঙালি মননে জড়িয়ে আছে। ফেলুদার থিম
মিউজিকও সত্যজিতের সৃষ্টি। গল্প অনুযায়ী, ফেলুদার বসার ঘরে যামিনী রায়ের একটি চিত্র আছে। “ সোনার
কেল্লা” শুটিংয়ের সময় সেই ছবিটি নিজে হাতে এঁকেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ।

গুপী গাইন ও বাঘা বাইন কে নিয়ে তিনটি ছবি কতাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কাজ, গুপী বাঘার তিনটি ছবিতেই
তিনি সুর করেছিলেন, এমনকি “গুপী গাইন বাঘা বাইন”-এ ‘ভুতের রাজা’-র গলাও উনি করেছিলেন হাঁড়ির মধ্যে
মুখ নিয়ে। বাঘ নিয়ে শুটিং করেছেন “ পায়ে পড়ি বাঘমামা” গানের সময়।

এছাড়াও “দেবী”, “নায়ক” ,“জলসাঘর”, “চারুলতা”, “মহানগর”, “ অরণ্যের দিনরাত্রি” , “অশনি সংকেত”, “তিন
কন্যা”, “ গণশত্রু”, “পরশপাথর” তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। “নায়ক”-এর আগে উত্তম কুমার মূলত রোমান্টিক হিসাবে
জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু “নায়ক” ওনার অভিনয় সত্তাকে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছিল। সত্যজিৎ রায় নিজেও
বলেছিলেন, “ এই ছবিতে আমি ভুল করতে পারি কিন্তু উত্তম কোনো ভুল করেনি।”

“দেবী চৌধুরানী” নিয়ে ছবি করার ইচ্ছা ছিল ওনার। মুখ্য ভূমিকায় থাকবেন সুচিত্রা সেন। তিনি ওই সময় সুচিত্রা
সেনের ‘এক্সক্লুসিভ ডেট’ চেয়েছিলেন ( ওই সিনেমার শুটিং চলাকালীন নায়িকা অন্য কোনো ছবিতে অভিনয়
করতে পারবেন না ) কিন্তু সুচিত্রা সেন দিতে পারেননি ‘এক্সক্লুসিভ ডেট’। সত্যজিৎ-ও আর করলেন না “ দেবী
চৌধুরানী”। নিজের চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে এমনই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। লালমোহনবাবুর
চরিত্রের অভিনেতা সন্তোষ দত্তর প্রয়াণের পর সেই জন্য তিনি আর ফেলুদা নিয়ে ছবি তৈরি করেন নি।

সারাজীবন ধরে অনেক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। চলচ্ছিত্রের জন্য পেয়েছেন ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্মান
‘ভারতরত্ন’, সাম্মানিক ‘ডি.লিট’ পেয়েছেন , বেশ কয়েকবার ‘জাতীয় পুরস্কার’ পেয়েছেন। অক্সফোর্ড
ইউনিভার্সিটি ওনাকে সাম্মানিক ডিগ্রিতে ভূষিত করে। পেয়েছেন ‘লিজিয়ন অফ দি অনার’, ‘দাদাসাহেব ফালকে’
এবং সাম্মানিক অস্কার।

তিনি ছিলেন আশাবাদী, তাঁর ছবিগুলি দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। “পথের পাঁচালী” থেকে যার শুরু। “ অশনি
সংকেত” ছবিতে আসন্ন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি থাকলেও সেই ছবি শেষ অবধি আশা জাগায়। “ মহানগর”-এও সেই
আশা, নতুন করে বাঁচবার আশা। “নায়ক” ছবিতেও অরিন্দম খুঁজে পায় তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া আশা।
“হীরক রাজার দেশে” শেষে ‘ দড়ি ধরে মারো টান ’ দর্শককে উজ্জীবিত করে। ওনার শেষ ছবি “আগন্তুক”-এ
যেখানে মানুষ ভয়ঙ্কর এক সভ্যতাকে গড়েছে, সেখানেও তিনি আশা হারান নি। একটা শব্দ,
‘ফ্লক্সিনিসিনিহিলিপিলিপিকেশন’ যা দিয়ে সভ্যতার অসারত্ব তিনি সহজেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। মানুষ চাইলে শেষ
অবধি যেতে, জিতবেই – ইতিবাচক এই বাণীই তাঁর সিনেমা ও লেখাগুলোতে স্পষ্ট এবং তা দর্শক ও পাঠকমনেও
আশার আলো জাগায়। সমাজের নানা স্তরের মানুষের গল্প বলেছেন তিনি ক্যামেরার মাধ্যমে যার সাথে দর্শক
একাত্ম হতে পারেন ; চরিত্রের দুঃখ, রাগ, আনন্দ সব কিছুই যাতে দর্শকদের স্পর্শ করে সেদিকে খেয়াল রেখে
উনি ছবি বানাতেন।

ছোটদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন শিশু ও কিশোরদের জন্য গল্প,
সৃষ্টি করেন বাঙালির শার্লক হোমস রূপে ‘ফেলুদা’ তার অ্যাসিস্টেন্ট ‘তোপসে’ ও বন্ধু ‘লালমোহন গাঙ্গুলি’ ওরফে
‘জটায়ু’। দেশে-বিদেশে নানা জায়গায় ফেলুদার নানা গোয়েন্দাগিরির কাহিনী লিখেছেন তিনি যাদের মধ্যে
“গোরস্থানে সাবধান”, “টিনটোরেটোর যীশু”, “সোনার কেল্লা” প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কল্পবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তাঁর
অবাধ বিচরণ ছিল। ‘প্রফেসর শঙ্কু’-র কাহিনীগুলি তার প্রমাণ। এছাড়াও কল্পবিজ্ঞানের বেশ কিছু গল্প তিনি
লিখেছেন যেগুলির মধ্যে “বঙ্কুবাবুর বন্ধু”, “গোলাপীবাবু ও টিপু”, “ময়ূরকন্ঠী জেলি”, “ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট” প্রভৃতি
উল্লেখযোগ্য।

ফেলুদার কাহিনীগুলো বলা হয়েছে তোপসের জবানিতে, যেমন হোমেসের কাহিনীগুলো ওয়াটসনের জবানিতে
লেখা। অন্যদিকে প্রফেসর শঙ্কু একজন বৈজ্ঞানিক যার রহস্যময় অন্তর্ধানের পর তার ডায়রি থেকে পাওয়া যায়
লেখা, ডায়রি আকারে শঙ্কু লেখা হয়েছে। হাস্যরস সৃষ্টি করতেও তিনি যে পারদর্শী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়
ওনার “তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম” বইটিতে। এছাড়া তাঁর সৃষ্ট আরেকটি মজার চরিত্র ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিন’-এর
ছোট হাসির গল্পগুলিও জনপ্রিয়। বাচ্ছারা গল্প শুনতে ভালোবাসে– এই ভাবনা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন
‘তারিণীখুড়ো’ যে চরিত্র বাচ্ছাদের তার জীবনে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনা শোনায়। সহজ-সরল অথচ শিক্ষণীয়
ছোটগল্প লেখাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

‘অপু ট্রিলজি’ বানানোর স্মৃতি সঞ্চয় করতে তিনি লেখেন “My Years with Apu:A Memoir” বইটি। চলচ্ছিত্রের
উপর তিনি তিনটি বই লিখেছিলেন, সেগুলি “Our Films, Their Films”, “বিষয় চলচ্ছিত্র” এবং “ একেই বলে
শুটিং”। “Our Films, Their Films” বইটি আজও সমগ্র বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববরেণ্য এই মানুষটি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। স্ত্রী ও পুত্র নিয়ে ওনার সুখের সংসার ছিল। স্ত্রী বিজয়া
রায় শুধু সাংসারিক জীবনেই নয়, কাজের ক্ষেত্রেও ওনার যথার্থ অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন। পুত্র সন্দীপ রায়কে নিজে
হাতে কাজ শিখিয়েছেন তিনি যিনি বর্তমানে বাংলা চলচ্ছিত্রের একজন সফল পরিচালক।

আকিরা কুরসাওয়া থেকে রাজ কাপুর , ওনার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। বলিউডের শাহেনশা অমিতাভ বচ্চন
ওনার সিনেমায় অভিনয় না করতে পারার দুঃখ আজও প্রকাশ করেন( “শতরাঞ্চ কে খিলাড়ি” সিনেমায় ওনার
কণ্ঠ ছিল )। পরবর্তীকালে ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, শ্যাম বেনেগাল, দিবাকর ব্যানার্জী প্রমুখ
পরিচালকরা ওনার দেখানো পথ অনুসরণ করেছেন।

স্রষ্টার মৃত্যু হয় না,সৃষ্টির মধ্যে বেঁচে থাকেন স্রষ্টা। সেই জন্যই ১৯৯২ সালে চলে গেলেও সত্যজিৎ রায় আজও
প্রতিটি সিনেমাপ্রেমী ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন এবং চিরকাল এই মহান স্রষ্টা বেঁচে থাকবেন
তাঁর সৃষ্টির মধ্যে।

ঋণ স্বীকার : গুগল , সত্যজিৎ রায় – বিজিত ঘোষ।

আরো পড়ুন –

Related:

Comments